| রবিবার, ০৩ মে ২০২৬ | প্রিন্ট


বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, হাওরের ফসলহানি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে। তবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে সতর্ক থাকতে হবে। এটি যেন পক্ষপাতদুষ্ট না হয়। হাওর অঞ্চলের চলমান বন্যা, জলাবদ্ধতা ও ফসলহানির প্রেক্ষাপটে টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে ১৬ দফা সুপারিশ তুলে ধরেছে সংগঠনটি।
রবিবার (৩ মে) জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘হাওর অঞ্চলে চলমান বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ফসলহানি, দুর্যোগ পরিস্থিতি এবং হাওরবাসীর দাবি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়। বাপা’র সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদারের সভাপতিত্বে ও সংগঠনটির কোষাধ্যক্ষ আমিনুর রসুলের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি অধ্যাপক কাসমির রেজা।
লিখিত প্রবন্ধে অধ্যাপক কাসমির রেজা বলেন, দেশের মোট উৎপাদিত ধানের প্রায় ২০ ভাগ আসে হাওর থেকে। তাই হাওরে ফসলহানি হলে সারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং খাদ্য অধিকারকে তা প্রভাবিত করে।
বর্তমান দেশীয় ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় যা খুব উদ্বেগজনক। চলতি বোরো মৌসুমে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত তিন দফা বৃষ্টিপাত এবং কয়েকটি হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ফলে হাওরের অন্তত ৭৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া শিলাবৃষ্টিতে আরো প্রায় ৮০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো হাওর অঞ্চল এবং মেঘালয়ের পাহাড়ে বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
এ বিষয়ে অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, হাওরে প্রতি বছর বন্যা এবং ব্যাপক ফসলহানি হয়ে থাকে। সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে কাজের কাজ হয় না। সেখানে ফসল হারিয়ে অনেক কৃষক হার্টফেল করে মারা যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। প্রতি বছর হাওরের ফসল ক্ষতি থেকে রক্ষা করার জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে, কিন্তু বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না কেন, সে বিষয়ে ভাবতে হবে। সেখানে সরকারি সংশ্লিষ্ট অধিদফতর ও মন্ত্রণালয় এবং প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের পকেট ভারী করার জন্য মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, হাওর অঞ্চলের মানুষের জন্য বন্যার সংকেত ব্যবস্থা প্রচলন করতে হবে। হাওরে স্লুইস গেট নির্মাণ অবিলম্বে বন্ধ করে হাওরের পানির প্রবাহ বহমান রাখতে হবে। হাওরের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক মহাপরিকল্পনা নিতে হবে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক যেন ক্ষতিপূরণ পায়, তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।
লেখক ও গবেষক গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে সতর্ক থাকতে হবে। এটি যেন পক্ষপাতদুষ্ট না হয়। এই ফসলহানির ফলে বাল্যবিবাহসহ বিভিন্ন সামাজিক সংকট দেখা দেবে। শিশুরা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়বে। এসব সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। বর্গাচাষি মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের সহায়তা প্রদান করতে হবে।
বাপার কোষাধ্যক্ষ আমিনুর রসুল বলেন, কোরবানির পশুর একটি বিরাট অংশ আসে হাওর অঞ্চল থেকে। সেখানে সাম্প্রতিক বন্যা কারণে গবাদি পশুগুলো রাখার জায়গা এবং খাদ্যের অভাবে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা। জলবায়ু তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে হাওড় সমস্যা সমাধানে ১৬ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ছিল ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বছরব্যাপী পরিবারপ্রতি ৩০ কেজি চাল ও এক হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান, নদী-খাল ও বিল খননের মাধ্যমে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা, অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করা, ফসল রক্ষা বাঁধে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর স্লুইস গেট নির্মাণ, হাওরের কৃষকদের কাছ থেকে অন্তত ১০ লাখ টন ধান সরাসরি ক্রয়, সুদমুক্ত ঋণ ও ঋণের পুনঃতফসিল, বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, জলমহালের লিজ বাতিল, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জলবায়ু তহবিল থেকে হাওরাঞ্চলে বরাদ্দ বাড়ানো।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, সুনামগঞ্জ সমিতি ঢাকার সাবেক সভাপতি ওমর খৈয়াম, হাওরাঞ্চলবাসী ঢাকার সমন্বয়ক হালিম দাদ খান, বাপার নির্বাহী সদস্য হাফিজুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট পারভীন আক্তার, হাজী শেখ আনসার আলী ও তিতলি নাজনিন, বাপা’র জীবন সদস্য ড. হারুন অর রশিদ ও ফরিদ হাসান, সাবেক অতিরিক্ত সচিব উমর খইয়াম প্রমুখ।
Posted ৩:৪৪ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৩ মে ২০২৬
www.pathokkantho.com | admin