| রবিবার, ০৩ মে ২০২৬ | প্রিন্ট


বাংলাদেশে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনলাইন বুলিং, সাইবার অপরাধসহ নানা ঝুঁকি শিশুদের পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদেরও শঙ্কিত করে তুলছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো কয়েকটি দেশ সম্প্রতি অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে বিধি-নিষেধ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—নিষেধাজ্ঞা, নাকি নিয়ন্ত্রণ? কোনটি কার্যকর সমাধান?
এ প্রেক্ষাপটে রবিবার (৩ মে) রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবালে ‘অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের নিচে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষিদ্ধ : আইনগত কাঠামো ও প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে ডেইলি সান।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর নজরদারিই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। গোলটেবিলে শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, বিশ্লেষক ও গবেষকরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডেইলি সানের এস এম শারমিন জাহান।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট ফাতেমা রশীদ হাসান বলেন, ‘ভালো এবং খারাপ দুটো দিকই পাশাপাশি আছে।
কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো কোমলমতি শিশুদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব।’
তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শিক্ষামূলক দিক উল্লেখ করে বলেন, ‘অনেক সময় দেখি ছোট শিশুরা কেক বানানো, ছবি আঁকা বা রঙের ব্যবহার শিখছে। এই শিক্ষামূলক দিকটি বাস্তব।’ তবে তিনি সতর্ক করেন, ‘সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন নারী ব্যবহারকারীরা অনলাইনে যৌন হয়রানির শিকার হয়।
অনেক ক্ষেত্রে এটি আত্মহত্যার চেষ্টার মতো ভয়াবহ পরিণতিও ডেকে আনতে পারে।’
আইওইর ইউসিএলের ফ্যাকাল্টি অব এডুকেশন অ্যান্ড সোসাইটির শিক্ষাবিদ ও প্রশিক্ষক ফিতরাত রশীদ বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যে করেছে। ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও ইন্দোনেশিয়া করছে। অস্ট্রিয়া, জার্মানি, মালয়েশিয়া ও গ্রিসও এ পথে এগোচ্ছে। এটি আর কোনো একক দেশের পরীক্ষা নয়, এটি বৈশ্বিক বাস্তবতা।
’ তিনি বলেন, ‘ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক—সব প্ল্যাটফর্মই বলে ১৩ বছরের নিচে শিশুদের জন্য নয়। কিন্তু বাস্তবে এগুলো কার্যকর নয়।’
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, ‘আমরা এখন অনেক শিশুকে প্রি-স্কুলে পাচ্ছি যাদের এডিএইচডি, বাকপ্রতিবন্ধকতা ও যোগাযোগ দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। অভিভাবকরা শিশুদের চুপ করিয়ে রাখতে ডিভাইস হাতে তুলে দিচ্ছেন, যার প্রভাব শ্রেণিকক্ষে স্পষ্ট।’
কেয়ার বাংলাদেশের সাবেক পরিচালক (স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ, অ্যাডভোকেসি ও কমিউনিকেশন) টনি মাইকেল গোমেজ বলেন, ‘১৬ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষিদ্ধ করা মানে ১৬ বছরেই তা উন্মুক্ত করে দেওয়া, যা আমাদের শিশুর অধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক তাসনিম এ. ইমা বলেন, ‘শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুইভাবে দেখতে হবে—কনটেন্ট ভোক্তা এবং কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে। এই দুটি ক্ষেত্রের জন্য ভিন্ন নীতিমালা প্রয়োজন।’
তিনি আরো বলেন, ‘ঢাকায় শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝুঁকে পড়ার বড় কারণ নিরাপদ বিনোদন ও সামাজিক মেলামেশার জায়গার অভাব। যদি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, তাহলে বিকল্প নিরাপদ জায়গাও তৈরি করতে হবে।’
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক কে এম এম আশফাক উল মুশফিক বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করাই সমাধান নয়। শিশুরা আমাদের চেয়ে বেশি প্রযুক্তি-সচেতন; তারা বিকল্প পথ খুঁজে নেবে।’
তিনি বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া মূলত শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট, বিশেষ করে কিশোরীদের আত্মহত্যার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে।’
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশনের উপপরিচালক রাহুল ম্যাথিউ বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না। আমাদের প্রয়োজন একটি সমন্বিত নিরাপদ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম।’
তিনি বলেন, ‘আমার সন্তান কিন্ডারগার্টেন থেকেই ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা পাচ্ছে। কোন সাইটে যাবে, কোনটি এড়িয়ে চলবে, কিভাবে পাসওয়ার্ড ব্যবহার করবে—এসব জানে। এ ধরনের শিক্ষা সব শিশুর জন্য নিশ্চিত করতে হবে।’
ডিজিটালি রাইটের হেড অব রিসার্চ আবদুল্লাহ তিতির বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা কখনো কার্যকর হয় না। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক আইনগুলো ১৬ বছরের নিচের শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে দূরে রাখতে পারেনি।’
তিনি আরো বলেন, ‘ক্ষতিকর কনটেন্ট শিশুদের কাছে পৌঁছানোর আগেই থামানোর মতো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। অথচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদম অনেক সময় সহিংস ও ক্ষতিকর কনটেন্টকে বেশি ছড়িয়ে দেয়।’
Posted ২:৫৪ পিএম | রবিবার, ০৩ মে ২০২৬
www.pathokkantho.com | admin
(538 বার পঠিত)
(391 বার পঠিত)
(281 বার পঠিত)
(191 বার পঠিত)