| সোমবার, ১৮ মে ২০২৬ | প্রিন্ট


বিয়েতে পুরনো পোশাকেই ভরসা গাজার কনেদের
ছবি : রয়টার্স
দক্ষিণ গাজার একটি ছোট্ট সেলাই কর্মশালায় স্তূপ করে রাখা পুরনো বিয়ের পোশাকের ভেতর থেকে একে একে কাপড় টেনে বের করেন সেলাই কারিগর নিসরিন আল-রান্তিসি। কোথাও ছিঁড়ে যাওয়া অংশে নতুন কাপড় জোড়া লাগান, কোথাও পুরনো পাথর খুলে নতুন নকশা বসান।
ধুলো জমে থাকা সাদা গাউনগুলো যেন তার হাতে আবার ফিরে পায় নতুন জীবন।
কখনো এই দোকানে নতুন কাপড়, ঝলমলে নকশা আর বিয়ের ব্যস্ততা ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। এখন সেখানে শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের হাহাকার ধ্বনি ভেসে আসে। কারণ দুই বছরের যুদ্ধ গাজার মানুষের কাছ থেকে শুধু ঘরবাড়িই কেড়ে নেয়নি, যেন কেড়ে নিয়েছে জীবনের ছোট ছোট আনন্দও।
যুদ্ধ সব কেড়ে নিয়েছে, তবু বিয়ে, ভালোবাসা কিংবা নতুন জীবন শুরুর স্বপ্ন থামাতে পারেনি। আর দাম্পত্যজীবন শুরুর সেই স্বপ্নটুকু বাঁচিয়ে রাখতে গাজার বহু পরিবার এখন ভরসা করছে পুরনো সংস্কার করা বিয়ের পোশাকের ওপর। যুদ্ধ ও লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির মধ্যেও হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন এই সেলাই কারিগরও।
নিসরিন আল-রান্তিসি বলেন, ‘এখন বিয়ের জন্য পুরনো গাউনগুলোই ব্যবহার করার চেষ্টা করি।
এ জন্য সামান্য মেরামত করি, ধুয়ে পরিষ্কার করি, নতুনভাবে সাজাই। মানুষ যেন অন্তত বিয়ের দিনটিতে একটু হাসতে পারে।’
পুরনো সাদা গাউনগুলো কিভাবে বিয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখছে সেই করুণ গল্প উঠে এসেছে রয়টার্সের এই প্রতিবেদনে।
বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে শুরুতে সাইকেলচালিত সেলাই মেশিন ব্যবহার করে কাজ করতে হয়েছে এই দর্জি নিসরিন আল-রান্তিসিকে। কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না।
তবু থেমে থাকে না তার কাজ।
যুদ্ধের আগে যে কাপড় তিনি ১২০ থেকে ১৫০ ইসরায়েলি শেকেল বা মুদ্রায় (৪১ থেকে ৫১ ডলার) কিনতেন, এখন তার জন্য গুনতে হচ্ছে প্রায় ৫০০ শেকেল (১৭১ ডলার)।
নিসরিন আল-রান্তিসি বলেন, ‘কনেদের গাউন ও শিশুদের পোশাকের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। যুদ্ধ আমাদের এমন এক দুষ্টচক্রে ফেলেছে, যার প্রভাব থেকে বের হওয়া কঠিন।’
গাজায় এখন অনেক বিয়েই হচ্ছে খুব ছোট পরিসরে। নেই জাঁকজমক, নেই আলোকসজ্জা। অনেকে এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বাড়ি কিংবা খোলা জায়গা, রাস্তার ধারে অথবা বিধ্বস্ত ভবনের ধ্বংসাবশেষের ওপর টাঙানো অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছেন। বিভিন্ন এলাকায় কনে এবং তাদের পরিবার এখন বিয়ের ন্যূনতম খরচও বহন করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
আমদানিকারকরা বলছেন, পণ্য সরবরাহে বিলম্ব, উচ্চ পরিবহন খরচ এবং বিয়ের পোশাকে ব্যবহৃত ঝলমলে ক্রিস্টালের মতো উপকরণে বিধিনিষেধ—এসবই সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ।
তাদের ভাষ্য, হরমুজ প্রণালির চলমান অচলাবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে সরবরাহকারীরাও সমস্যায় পড়ছেন।
সংঘাতের কারণে অনেক কর্মশালাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গাজার একটি বিয়ের পোশাকের দোকানের কর্মী রাওয়ান শালুফ। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের আগে সবার জন্যই পোশাকের দাম সহনীয় ছিল। এখন একটি গাউনের দাম শুনলে মানুষ হতবাক হয়ে যায়।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণকারী ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা কোগাট—এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া দেয়নি।
গাজার রাস্তাগুলো এখন ধ্বংসস্তূপে ভরা। কোথাও বিধ্বস্ত বাড়ির পাশে টাঙানো তাঁবু, কোথাও খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে পরিবারগুলো। ২০ লাখের বেশি মানুষের অধিকাংশই বাস্তুচ্যুত। এমন বাস্তবতায় বিয়ের আয়োজন যেন বিলাসিতা।
এত দুর্ভোগের মধ্যেও কিছু যুগল এখনো বিয়ের আনন্দ উদযাপনের পথ খুঁজে নিচ্ছেন।
একুশ বছর বয়সী শাহেদ ফায়েজের বিয়ের আর মাত্র চার দিন বাকি। কিন্তু এখনও তিনি একটি বিয়ের পোশাক খুঁজে পাননি।
62
শাহেদ ফায়েজ বলেন, ‘সবচেয়ে সস্তা পোশাকের দামই এক হাজার ডলার বা তার বেশি। অথচ আমাদের কাছে আছে ২০০ ডলারেরও কম।’
একটু থেমে যোগ করে বলেন, ‘পুরো দেনমোহর দিয়েও একটি পোশাকের দাম ওঠে না।’
গাজায় এখন সাদা পোশাকগুলো শুধু বিয়ের নয় বরং দাম্পত্যজীবনে বিশ্বাস রাখার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেঁচে থাকার লড়াইয়েও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়ার তীব্র আকুতিও জানাচ্ছে পুরোনো গাউনগুলো।
কণ্ঠে অসহায়তা লুকানোর চেষ্টা করে এই তরুণ বলেন, ‘পোশাকের নকশা কেমন, তা নিয়ে আমার কোনো ভাবনা নেই। আমি চাই, সেটি যেন শুধু নতুন হয়।’
Posted ৬:৪৫ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
www.pathokkantho.com | admin