আইন- আদালত
আইন- আদালত >>

পথ কত দূরে-

  |   রবিবার, ০৩ মে ২০২৬ | প্রিন্ট

পথ কত দূরে-

মানুষ ও রাষ্ট্রের সংকট কোনো নূতন বিষয় নহে। সভ্যতার ইতিহাস যত পুরাতন, সংকটও তত পুরাতন। কিন্তু প্রশ্ন-একবিংশ শতাব্দীতেও কেন তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশ একই বৃত্তে আবর্তিত? কেন স্বাধীনতা অর্জনের বহু দশক পরেও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও দক্ষ রাষ্ট্র গড়িয়া উঠে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজিতে গেলে কেবল অর্থনীতি বা রাজনীতির ভাষা যথেষ্ট নহে-প্রয়োজন দর্শনের, প্রয়োজন মানবচরিত্রের গভীর পাঠ।

এইখানে মহামতি চাণক্যের কথা স্মরণ করা অনিবার্য। তিনি বলিয়াছেন, ‘লোভীকে অর্থের দ্বারা, মূর্খকে তোষামোদ দ্বারা এবং জ্ঞানীকে যথার্থ জ্ঞানের দ্বারা বশ করা যায়।’ এই উক্তি কেবল রাজদরবারের কৌশল নহে-ইহা সমাজের শক্তির বিন্যাস নির্দেশ করে। যাহাকে অর্থ দিয়া বশ করা যায়, সে জ্ঞানী নহে-এই সত্য আজও অটল। আধুনিক রাষ্ট্রে যখন নীতি নহে, বরং সুবিধা ও লাভ সিদ্ধান্তের নিয়ামক হয়, তখন তৃতীয় বিশ্বের বহু রাষ্ট্রযন্ত্রই লোভীদের হাতে বন্দি হয়। এখানেই জন্ম নেয় দুর্নীতি, শোষণ ও বিশ্বাসঘাতকতা।

 

এই উপলব্ধি কেবল চাণক্যের নহে। গ্রিক দার্শনিক প্লেটোও প্রায় একই কথা তাহার ‘দ্য রিপাবলিক’-এ বলিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, যাহাদের শাসনের ভার, তাহাদের যদি জ্ঞানের ভার না থাকে, তাহা হইলে রাষ্ট্রের দুঃখ মোচন অসম্ভব। জ্ঞানহীন ক্ষমতা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি ক্ষমতাহীন জ্ঞান নিষ্ফল।

 

চাণক্য এই কারণেই সতর্ক করিয়া বলেন-সকল পাহাড়ে রত্ন মিলে না, সকল বনে চন্দন জন্মায় না। সমাজের সকল স্তরে নৈতিকতা প্রত্যাশা করিলে রাষ্ট্রনীতি কল্পনার উপর দাঁড়ায়। একই বোধ আমরা পাশ্চাত্যের দার্শনিক ম্যাকিয়াভেলির নিকটও পাই। তিনি ‘দ্য প্রিন্স’-এ নির্মম বাস্তবতায় বলিয়াছেন, ‘সকলের নিকট নৈতিকতা প্রত্যাশা করিয়া রাজনীতি করিতে গেলে পতন অনিবার্য।’ এইখানে আসিয়া নৈতিক দ্বিধা প্রকট হয়। চাণক্যের বিখ্যাত উক্তি-‘সরলের সঙ্গে সরলতা, শঠের সঙ্গে শঠতা।’ ইহা কি আদর্শের পরাজয়? নাকি আদর্শ রক্ষার কৌশল? ইতিহাস বলিতেছে-ইহা দ্বিতীয়টিই। কারণ আদর্শ যদি আত্মরক্ষা করিতে না পারে, তাহা হইলে তাহা বিলাসমাত্র। জার্মান দার্শনিক নিৎশেও ভিন্ন ভাষায় একই সতর্কতা উচ্চারণ করিয়াছেন-শঠের সঙ্গে লড়িতে গিয়া নিজে শঠ হইয়া যাইবার আশঙ্কা রহিয়াছে, এই সীমারেখা অতিক্রম করিলেই নৈতিক পতন।

 

তবু চাণক্য মানবিকতার মূল রেখা অক্ষুণ্ণ রাখেন। তিনি বলেন-‘যেই আচরণে নিজে কষ্ট পাও, সেই আচরণ অন্যের প্রতি করিও না।’ ইহা কেবল ভারতীয় দর্শন নহে, ইহা বিশ্বজনীন নীতি। কনফুসিয়াস প্রায় একই ভাষায় বলিয়াছেন, ‘তুমি যাহা নিজের প্রতি হওয়া কামনা করো না, তাহা অন্যের প্রতি করিয়ো না।’ সভ্যতার ভিন্ন প্রান্তে দাঁড়াইয়াও মনীষীরা একই নৈতিক সূত্রে উপনীত হইয়াছেন-ইহাই মানবিকতার প্রমাণ। কিন্তু নৈতিক বাক্য থাকিলেই সমাজ শুদ্ধ হয় না। সঠিক জায়গার সঠিক মানুষ চিনিবার বিদ্যা না থাকিলে রাষ্ট্র বারবার ভুল করে। চাণক্য বলেন- ‘মানুষকে ত্যাগ, চরিত্র, গুণ ও কর্ম দ্বারা পরীক্ষা করিতে হয়। এই পরীক্ষার অভাবেই আমরা জনপ্রিয়তাকে যোগ্যতা মনে করি, পদবিকে প্রজ্ঞা ভাবি।’ বিদ্যার প্রশ্নেও চাণক্য বিশেষভাবে কঠোর। তিনি বলিয়াছেন-‘যথার্থ বিদ্যা না থাকিলে মানুষের জীবন কুকুরের লেজের মতো নিষ্ফল।’ আধুনিক সমাজে ইহার প্রতিধ্বনি পাই ইমাম গাজ্জালির কথার মধ্যে- ‘কর্মবিহীন বিদ্যা অপচয় মাত্র, আর বিদ্যাবিহীন কর্ম নিছক মূর্খতা।’ জীবন ও রাষ্ট্র-উভয়ের জন্যই চাণক্যের আরো একটি আশ্বাস গভীর তাৎপর্য বহন করে। তিনি বলিয়াছেন- ‘সুখ ও দুঃখ চক্রাকারে ঘোরে।’ স্টোয়িক দার্শনিক মার্কাস অরেলিয়াসও একই সুরে বলিয়াছেন, ‘যাহারা বর্তমান দুঃখ (অথবা সুখ) চূড়ান্ত মনে করেন, তাহারা ইতিহাস বোঝেন না।’

 

এই সকল বাণী একত্রে আমাদের শিক্ষা দেয়-নীতি ও কৌশল, মানবিকতা ও বাস্তবতা, সংযম ও শক্তির ভারসাম্যই রাষ্ট্র ও মানুষের মুক্তির পথ। সেই পথ কত দূরে-আমরা জানি না।

Posted ৭:০৬ পিএম | রবিবার, ০৩ মে ২০২৬

www.pathokkantho.com |

এ বিভাগের আরও খবর

Publisher
প্রধান উপদেষ্টা: শেখ শাহীন হোসেন, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ন্যাশনাল প্রেস সোসাইটি (NPS) মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ। উপদেষ্টা: এ্যাড: ড. ওহিদুল রহমান (আইনজীবী )। প্রকাশক ও সম্পাদক : আশিষ সাহা , মফস্বল সম্পাদক: জাহিদুল ইসলাম, সহকারী সম্পাদক: আলাউদ্দিন মন্ডল, নির্বাহী সম্পাদক: বিধান কুমার সরকার, বার্তা সম্পাদক: বাঁধন সরকার।
Office Address

কর্পোরেট অফিস ঠিকানা:৫৫/বি পুরানা পল্টন নোয়াখালী টাওয়ার লিফট ১৪ রুম নং সি/এ, ঢাকা ১০০০ ই-মেইল dailypathokkantho@gmail.com অফিস ফোন +8809638278137