| রবিবার, ০৩ মে ২০২৬ | প্রিন্ট


কুপ্রবৃত্তির অনুসরণে মনুষ্যত্বের বিনাশ’ বলিয়া বাংলায় একটি নীতিকথার বহুল প্রচলন রহিয়াছে। লোভ-লালসা, প্রতারণা-ধোঁকাবাজি প্রভৃতি বাজে প্রবৃত্তির বশবর্তী হইয়া মানুষ প্রায়শই এমন সকল কর্মকাণ্ড করিয়া থাকে, যাহা মনুষ্যকুল ব্যতীত অন্য কোনো জীবের মধ্যে দেখা যায় না। পশু-পাখি একে অন্যের প্রাণ সংহার করিয়া থাকে নিছক উদর পূর্তি কিংবা নিজের অস্তিত্ব টিকিয়া রাখিবার প্রশ্নে-ইহা বাস্তুসংস্থানের নিয়ম; কিন্তু হোমো সেপিয়েন্স বা মানুষই একমাত্র জীব, যাহারা স্বজাতির ক্ষতি সাধন করে নিছক ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করিবার জন্য। এই সকল ক্ষেত্রে বাস্তুসংস্থানের কোনোই প্রশ্ন থাকে না, বরং থাকে কেবল ব্যক্তিগত লোভ-লালসা-লিপ্সা। বিভিন্ন সময় একশ্রেণির মানুষকে এমন সকল আচরণ বা কর্মকাণ্ড করিতে দেখা যায়, এমনভাবে অন্যের ক্ষতি সাধন করিতে দেখা যায়, যাহা সম্পূর্ণরূপে মনুষ্যত্ব-বিবর্জিত। ‘দো পেয়ে দৈত্য’ মানুষের হাতে মানুষেরই ক্ষতি সাধন-ইহা কেমন কথা!
পত্রিকান্তরে প্রায়শই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় ‘পার্টি কালচার’ সংক্রান্ত নানা আখ্যান! ইহা সেই বিশেষ পার্টি, যাহাদের কবলে পড়িয়া প্রতিদিন অনেক মানুষ সর্বস্বান্ত ও নিঃস্ব হইতেছেন-তাহারা হইল অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি। এই পার্টির সদস্যদের দৌরাত্ম্যপনা বেশ পুরাতন সংস্কৃতি; নানা কৌশলে তাহারা তৎপর থাকেন নৌ, সড়ক কিংবা রেলপথে। বিশেষ করিয়া, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, পঞ্চগড়-ঢাকা রেলপথের ন্যায় ব্যস্ততম রুটগুলিতে তাহারা যেন অতি চিনা মুখ! প্রতিনিয়তই দেশের বিভিন্ন রুটের কোনো না কোনো ট্রেনের যাত্রী এই দুষ্কৃতকারীদের শিকারে পরিণত হইয়া সর্বস্ব হারাইতেছেন। ভুক্তভোগী যাত্রীদের বর্ণনা অনুযায়ী, স্টেশনগুলিতে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা ওত পাতিয়া থাকেন; ট্রেন স্টেশন ছাড়িবার পর যাত্রীদের সহিত প্রথমে তাহারা ভালো সম্পর্ক তৈরি করেন, নানা ধরনের গল্প করিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তাহারা সঙ্গে থাকা চকলেট, শরবত, আচার, ডাব প্রভৃতি খাবার খাইতে দেন যাত্রীদের। সেই খাবার খাওয়ার পর অচেতন অবস্থায় পড়িয়া থাকেন যাত্রীরা। ইহার পর যাহা হইবার তাহাই হয়! যাত্রীর সর্বস্ব কাড়িয়া লয় অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। তাহাদের খপ্পরে পড়িয়া হররোজ এইভাবে সর্বস্ব হারাইতেছেন অনেক ট্রেন যাত্রী। দুষ্কর্মকারীরা তাহাদের কথার জাদুতে, বিনয়ী আচরণের মাধ্যমে অত্যন্ত সুকৌশলে যাত্রীদের বশে আনিয়া এহেন ক্ষতিসাধন করিয়া যাইতেছেন।
ট্রেন হইল আমাদের যাত্রাপথের অন্যতম বাহন। সুবিধা বিবেচনায় বিপুলসংখ্যক যাত্রী প্রতিদিন ট্রেনযোগে দেশের এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করিয়া থাকেন। অথচ সেই জনপ্রিয় বাহনটিই অজ্ঞান বা মলম পার্টির সদস্যদের টার্গেটে পরিণত হইয়াছে। জনবলসংকটের কারণে রেল পুলিশ তাহাদের থামাইতে হিমশিম খাইতেছে, যাত্রীরাও আশানুরূপ সচেতন নহেন, আর এই সুযোগটিই কাজে লাগাইতেছেন অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। পুলিশ-প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট মহল যাত্রাপথে অপরিচিত কাহারো নিকট হইতে কিছু খাইতে বারংবার নিষেধ করিয়া থাকেন বটে; কিন্তু কিছু যাত্রী না বুঝিয়া ভুলবশত অন্যের দেওয়া খাবার গ্রহণ করিয়া থাকেন। ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে যেইখানে অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি বা গুঁড়ামরিচ পার্টির অপতৎপরতা কাহারো অজানা থাকিবার কথা নহে, সেইখানে যাত্রীরা এই বিষয়ে আরো সচেতন হইবে না কেন? অধিকন্তু, অজ্ঞান ও মলম পার্টির শিকার ভুক্তভোগীরা থানায় খুব একটা অভিযোগ করেন না বলিয়া পুলিশের দাবি, এমনটি কেন হইবে? যাত্রীবেশে মানুষের পকেট কাটা, তাহাদের সর্বস্ব লুটিয়া লওয়া-এই জাতীয় প্রবণতা বন্ধে ভুক্তভোগীদের সোচ্চার ভূমিকা পালন এবং আইনের দ্বারস্থ হওয়াই কি কাম্য নহে?
উন্নত বিশ্বে এইরূপ পার্টি কালচার অকল্পনীয় হইলেও উন্নয়নশীল বিশ্বের সমাজব্যবস্থায় ইহা যেন এক ‘চিরস্থায়ী প্রবণতা’ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। রেল, সড়ক, নৌপথগুলিতে এই সকল পার্টির সদস্যরা ঘাপটি মারিয়া বসিয়া রহিয়াছেন। বিশেষ করিয়া, উৎসবের সময় তাহারা অধিক সক্রিয় হইয়া উঠেন। আসন্ন রমজানের পর পবিত্র ঈদুল ফিতরের উৎসব ঘিরিয়া তাহারা যে নূতন করিয়া ছক কষিতেছেন, সেই কথা বলাই বাহুল্য। সুতরাং, তাহাদের লাগাম টানিয়া ধরিবার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরো সজাগ দৃষ্টি দিতে হইবে, বাড়াইতে হইবে নজরদারি ও মনিটরিং। সর্বোপরি, এই অপসংস্কৃতি বন্ধে যাত্রী সাধারণের সচেতনতা অবলম্বনের বিকল্প থাকিতে পারে না।
Posted ৭:০৫ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৩ মে ২০২৬
www.pathokkantho.com | admin