
মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু সংকট শুধু একটি ভূখণ্ডের সমস্যা হয়ে থাকে না—তা হয়ে ওঠে মানবতার বিবেকের পরীক্ষা। রোহিঙ্গা সংকট তেমনই এক নির্মম বাস্তবতা, যেখানে রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং মানবাধিকারের ভাষ্য এক অদ্ভুত নীরবতায় বন্দি হয়ে আছে।
বছরের পর বছর ধরে এই সংকট চলমান, কিন্তু সমাধানের প্রশ্নটি যেন ইচ্ছাকৃতভাবে অনির্দিষ্ট রাখা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে—সমাধান কোথায়? আদৌ কি কেউ সমাধান চায়?
২০১৭ সালের সহিংসতার পর মায়ানমার থেকে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে।
সীমিত সম্পদের দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ মানবিকতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। কক্সবাজারের পাহাড়-জঙ্গল কেটে তৈরি হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির। কিন্তু এই মানবিকতার ভার আজ এক অদৃশ্য বোঝায় পরিণত হয়েছে—অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত চাপ দিন দিন বেড়েই চলেছে।
সবচেয়ে কঠোর সত্যটি হলো—এই সংকটের মূল কারণ মায়ানমারের রাষ্ট্রীয় নীতিতে নিহিত।
রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার, তাদের ওপর দীর্ঘদিনের বৈষম্য এবং সামরিক অভিযানের নামে নিপীড়ন—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিত জাতিগত নির্মূলের ইঙ্গিত বহন করে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এ নিয়ে নিন্দা, প্রতিবাদ, এমনকি আইনি প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—মায়ানমারের সামরিক জান্তা এসবের তোয়াক্কা করছে না। কারণ তারা জানে, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর নিন্দা অনেক সময় কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে।
এখানেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাতিসংঘের অসংখ্য বৈঠক, প্রস্তাব, বিবৃতি—সবই যেন এক ধরনের কাগুজে প্রতিবাদ। বাস্তব চাপ সৃষ্টি করতে যে ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা দেখা যায় না। বড় শক্তিগুলো নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে মিয়ানমারকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে চায় না। ফলে মানবাধিকারের প্রশ্নটি বারবার রাজনীতির কাছে পরাজিত হয়।
আরেকটি বাস্তবতা হলো—রোহিঙ্গা সংকট এখন ‘দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে, যা আসলে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা। আসলে যখন কোনো সংকট দীর্ঘায়িত হয়, তখন সেটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক সহানুভূতি কমে যায়, তহবিল সংকুচিত হয় এবং শরণার্থীরা পরিণত হয় এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বহমান এক অনিশ্চিত জীবনের বন্দি জনগোষ্ঠীতে।
বাংলাদেশের অবস্থান এই প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জটিল। একদিকে মানবিক দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থ। দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় দেওয়ার ফলে স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বন উজাড়, শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা, আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ—এসব বাস্তব সমস্যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অথচ আন্তর্জাতিক সহায়তা ধীরে ধীরে কমে আসছে, যা পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলছে।
সবচেয়ে হতাশাজনক দিক হলো—রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, তালিকা বিনিময়—সবকিছুই হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাও নিরাপদে ফিরে যেতে পারেনি। কারণ খুবই স্পষ্ট : নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং মর্যাদার নিশ্চয়তা ছাড়া কেউই স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে চায় না। আর মিয়ানমার সেই নিশ্চয়তা দিতে প্রস্তুত নয়।
এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—সমাধান কি কেবল প্রত্যাবাসনেই সীমাবদ্ধ? নাকি বিকল্প পথ খুঁজতে হবে? আন্তর্জাতিক মহল প্রায়ই ‘তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন’-এর কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে এর অগ্রগতি অত্যন্ত সীমিত। কিছু দেশ সীমিত সংখ্যক রোহিঙ্গাকে গ্রহণ করলেও তা মোট সমস্যার তুলনায় নগণ্য। ফলে এই প্রস্তাব কার্যকর সমাধান হয়ে উঠতে পারেনি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—শরণার্থী শিবিরের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চিত জীবনে থাকার ফলে সেখানে হতাশা, অপরাধপ্রবণতা এবং চরমপন্থার ঝুঁকি বাড়ছে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা একটি পুরো প্রজন্মকে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এটি শুধু মানবিক সংকট নয়; বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও একটি সম্ভাব্য হুমকি।
তাহলে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কোথায়?
প্রথমত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কেবল বক্তব্যের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। মিয়ানমারের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা—এসব পদক্ষেপ বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যদি একসঙ্গে অবস্থান নেয়, তাহলে মায়ানমারের ওপর চাপ বাড়ানো সম্ভব।
তৃতীয়ত, রোহিঙ্গাদের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন মানবিক ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করতে হবে। শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে তারা শুধু সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। এতে করে শিবিরের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাও বাড়বে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই সংকটকে ‘ভুলে যাওয়ার’ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা। রোহিঙ্গারা কোনো পরিসংখ্যান নয়; তারা মানুষ, তাদের অধিকার আছে, মর্যাদা আছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এই মৌলিক সত্যটিকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে এই সংকট শুধু দীর্ঘায়িতই হবে না—বরং আরো জটিল ও বিপজ্জনক রূপ নেবে।
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান আছে—কিন্তু সেই সমাধান বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তর্জাতিক ঐক্য এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই তিনটির সমন্বয় এখনো দেখা যায়নি। ফলে ঘুরেফিরে বারবারই প্রশ্ন উঠছে যে, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান আসলে কোথায়?
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা